করতোয়ায় ওদের জীবন-জীবিকা; পঞ্চগড়ে মিলছে উন্নত বালু

পঞ্চগড় থেকে কামরুল ইসলাম কামু ॥ দেশের উত্তর জনপদের প্রান্তসীমায় অবস্থিত পঞ্চগড় জেলা। দেশের অভ্যন্তরে বড় নদীগুলোর মধ্যে করতোয়া অববাহিকায় রয়েছে সামান্য জলস্রোত। যদিও শুষ্ক মৌসুমে নদীর চরে চরে জেগে থাকে বালুর স্তর। নদীটির উতপত্তিস্থল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ৯০ দশকের আগেই নদীটি তার পুরনো চেহারা হারিয়ে ফেলে। এক সময় পুরো নদী জুড়ে ছিলো পানির স্রোত, বহমান ছিল সুবিশাল জলরাশি। প্রতিবেশী ভারত উজানে বাঁধ দেয়ার কারণে করতোয়া তার নব্যতা হারিয়ে ফেলে। হারিয়ে যায় নদীর গতি-প্রকৃতি। ধ্বংস হয়ে যায় মাছের ঘের। নদীর বুকজুড়ে ভেসে ওঠে চিকচিকে বালুর চর। সীমান্ত এলাকা তেতুঁলিয়া থেকে করতোয়া তার গন্তব্যসীমা পঞ্চগড় হয়ে বয়ে চলেছে দিনাজপুর-বগুড়ার অববাহিকায়। এক নামে চেনে শত মানুষ সেই করতোয়া নদী। পরিবেশ রক্ষার তাগিদে অবৈজ্ঞানিক পন্থায় ড্রেজার, বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলা এখন বন্ধ; এক সময় যা ছিলো এ অঞ্চলে প্রধান ব্যবসা। হাজারো মানুষ তখন পাথর উত্তোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। ড্রেজার, বোমা মেশিন বন্ধ করার জন্য দীর্ঘ সময় আন্দোলন ছিলো জেলাজুড়ে। পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার, বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ বেকার হলেও পরিবেশ ও প্রকৃতি এখন শান্ত, পাখ-পাখালীর কলকাকলীতে মুখর। তবে অর্থনীতি স্থবির। ব্যাংক-বীমায় লেনদেন নিম্নমুখী। তেতুঁলিয়ার শালবাহান, ভজনপুর, বুড়াবুড়িসহ অত্রাঞ্চলের অনেকে এখন জীবিকার তাগিদে নিজেদের পুরনো পেশা ছেড়ে চলে গেছে রাজধানীতে। কেউ কেউ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে পাথর আমদানি করছে। জীবন যেনো থেমে নেই। পাথর উত্তোলন বন্ধ হলেও সনাতন পদ্ধতিতে অনেক পাথর শ্রমিক পাথর উত্তোলন করছে। শত বছরের সংষ্কৃতি এখানে বিদ্যমান। সাথে রয়েছে বালু উত্তোলনের বিশাল কর্মযঞ্জ। পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীর বালুর চাহিদা রয়েছে সারাদেশে। স্বচ্ছ ও ঝলক দানার এ বালু। শতভাগ পরিছন্ন বালুতে কোন মিশ্রতা নেই। ধুলি আর ময়লাবিহীন এ বালু যায় যশোর, খুলনাসহ দেশের নানা অঞ্চলে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার মীরগড়, আমতলা, ভজনপুর এবং বোদা উপজেলার মাড়েয়া, তেপুখুরিয়া, বনগ্রাম বেংহাড়ি, দেবীগঞ্জের শালডাঙ্গা, দেবীডুবা ও সদরে রয়েছে বালুর নানা পয়েন্ট। কখনো কখনো বালু উত্তোলন বাড়াতে চুপিসারে অনেকে বোমা মেশিন ব্যবহার করতে গেলে প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন থেকে বালু মহল, পাথর মহল, ভাসাকাঠ মহল ইজারা প্রদান করা হয়। প্রতি বছর এ ইজারা থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ড্রেজার ও বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকে বালু উত্তোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। পঞ্চগড় থেকে শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ভর্তি বালু যায় জেলার বাইরে। বর্ষা মৌসুমে এ ব্যবসা প্রায় বন্ধ থাকে। এখন সেই বালুর ব্যবসা জোরেসোরে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এমনটাই দেখা গেলো তেপুখুরিয়া ও বোয়ালমারি বারুনী ঘাট এলাকায়। বালু উত্তোলনে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জীবিকার জন্য শত শত মানুষ এ পেশার সাথে জড়িত। বোদা উপজেলার মাড়েয়া এলাকার বালু ব্যবসায়ী আজাদ জানান, বালু ব্যবসা একটি পরিপূর্ণ স্বচ্ছ ব্যবসা, যা গরীব মানুষের জন্য বিশাল সহায়ক হয়ে আছে। এ কাজ যদি শ্রমিকরা না পেতো, তাহলে গরীব মানুষ কি করতো, জানি না। নদীর জেগে ওঠা চরে বালু উত্তোলন করে ট্রাক লোড দেয়া হয়। কাক ডাকা ভোরে শুরু হয় এ বালু উত্তোলনের কাজ। পঞ্চগড়ের আমতলা, তেতুঁলিয়ার নিজবাড়ি এলাকায় সোমবার (১২ অক্টোবর) দেখা গেলো নৌকা ভরে বালু উত্তোলন করছে শ্রমিকরা। ঘাটে ভিড়ে বালু ফেলে স্তূপ করে ট্রাক লোড দিচ্ছে। বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতরা জানান, পাথর উত্তোলন বন্ধ। এখন বালু তোলার কাজ করি। বালু তুলে সারাদিনে আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কি করার আছে, সংসার তো চালাতে হবে। দেবীগঞ্জ উপজেলার পাখুরীতলার বালু শ্রমিক বাচ্চু জানান, তিনি বালু তোলার কাজ করেন। প্রতিদিন ট্রাক লোড দেন। এতে তার আয় হয় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। আরেক শ্রমিক ইউসুফ আলী জানান, তিনিও প্রতিদিন বালু লোড দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। সংসারে তার এক কন্যা সন্তান আছে। সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। এমন অনেক শ্রমিক আছে জেলা জুড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *